Breaking News
Home / কাপাসিয়া / কাপাসিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে সাম্মাম চাষ

কাপাসিয়ায় বাণিজ্যিকভাবে সাম্মাম চাষ

কাপাসিয়ায় বানিজ্যিকভাবে স্বল্প জীবনকাল সম্পন্ন উচ্চমূল্যের সাম্মাম (রকমেলন) নামের বিদেশি এ ফল চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে কাপাসিয়া উপজেলার সূর্য নারায়ণপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মো: কামরুজ্জামান খান।

এই সাম্মাম ফল দেখতেও যেমন লোভনীয় আবার খেতেও সুস্বাদু। ফলটি মিষ্টি কম হলেও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। ডায়েবেটিকসের রোগীসহ সব বয়সী মানুষের জন্য সাম্মাম একটি উপযোগী খাবার ফল। বাংলাদেশের বাজারসেহ বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রে এ ফলের কদর রয়েছে বেশ।

বছরের বেশিরভাগ সময় যেসব জমি পতিত অবস্থায় পড়ে থাকতো,সেই জমিতেই এখন মাচায় ঝুলছে সারি সারি বিদেশি জাতের ফল। সবুজ-হলুদ রঙের ফলগুলো দেখতে অনেকটা তরমুজের মতো। তবে নাম সাম্মাম পরিচিত ‘রক মেলন’ নামেও। কাপাসিয়ায় বর্গা নেওয়া জমিতে এ ফলের চাষ করে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন কৃষি উদ্যোক্তা মো. কামরুজ্জামান খান।

তিনি উপজেলার সূর্য নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মো: কামরুজ্জামান খাঁন তরগাঁও ইউনিয়নের উত্তর খামের এলাকায় জমি লিজ (চুক্তিতে) নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে সাম্মাম (রকমেলন) চাষ করেছেন। মালচিং ফিল্ম ব্যবহার করে গাছের পরিচর্যা করছেন তিনি। এরই মধ্যে বাগান থেকে প্রথম দফায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। তার প্রত্যাশা, সব ফল বিক্রি হলে মোট বিক্রি ৬-৭ লাখ টাকা ছাড়াতে পারে।

তবে এ প্রত্যাশার বিপরীতে এখন পর্যন্ত তার বিনিয়োগও কম নয়। জমি, চারা, শ্রমিক, সার, সেচ, মালচিং ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সরেজমিনে তরগাঁও ইউনিয়নের উত্তর খামের এলাকায় কৃষি উদ্যোক্তা কামরুজ্জামানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, জমির ওপর মালচিং ফিল্ম বিছানো। তার ওপর নির্দিষ্ট দূরত্বে লাগানো হয়েছে সাম্মামের চারা। লতাগুলো মাচায় উঠছে। কোনো গাছে ছোট ফল, আবার কোনো গাছে পরিপক্ব হওয়ার পথে বড় আকারের ফল ঝুলছে।

বাগানে শ্রমিকদের ব্যস্ততাও চোখে পড়ার মতো। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছে পানি দিচ্ছেন, আবার কেউ ফল ও লতার পরিচর্যা করছেন।

প্রশ্নের জবাবে কৃষক কামরুজ্জামান খান বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রথম দফায় ৫০ হাজার টাকার মতো সাম্মাম বিক্রি করেছি। ফল পুরোপুরি বিক্রি হলে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা বিক্রির আশা করছি।

তিনি আরো বলেন, বাগানের উৎপাদিত ফল স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকার কারওয়ান বাজার আড়তে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে পাইকারের কাছে প্রতি কেজি প্রায় ৮০-১০০ টাকা দরে সাম্মাম বিক্রি করছেন।

তরুণ এই কৃষি উদ্যোক্তা কামরুজ্জামান খান কাপাসিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছেন। চাকরি বা প্রচলিত পেশার বাইরে কৃষিকে আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। তার দাবি, এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পরিবারের পাঁচ সদস্যের সংসার চালানোর পাশাপাশি কয়েকজন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

কামরুজ্জামান বলেন, কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করেছি। এখন পর্যন্ত লোকসানের মুখে পড়তে হয়নি। সামনে আরো বড় পরিসরে বিদেশি ফলের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকে বিদেশি ফলের আবাদ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।এছাড়াও আগামীতে বড় পরিসরে আনারের বাগান করবো।

এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ শাকিল আহম্মেদ জানান, সাম্মাম (রকমেলন) চাষে সাধারণত ৭৫-৯০ দিন সময় লাগে। সঠিক পরিচর্যা ও বাজারদর পাওয়া গেলে প্রতি বিঘায় ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন খরচ হতে পারে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। তবে বাস্তবে জমির ধরণ, শ্রম, উপকরণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর খরচ কমবেশি হতে পারে।

তিনি বলেন, সাম্মামে বেটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ফলিক অ্যাসিড,ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। তবে এ ফসলের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরিচর্যা,পানি ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

তিনি আরো জানান, কাপাসিয়ার তরগাঁও, টোক, বারিষাব ও সনমানিয়া এলাকার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকার দোআঁশ মাটি সাম্মাম চাষের জন্য উপযোগী হতে পারে।

সাম্মাম চাষে ফলন পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে বাজার। বর্তমানে কামরুজ্জামান তার উৎপাদিত ফল ঢাকার আড়তে পাঠাচ্ছেন। সেখানে প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা পাওয়া গেলেও মৌসুমের শেষ পর্যন্ত একই দাম থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কোনো ফলের বাণিজ্যিক চাষে উৎপাদন সফল হওয়ার পর বাজারজাত করণই বড় চ্যালেঞ্জ। ফল দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় সংগ্রহের পর দ্রুত পরিবহন ও বিক্রির ব্যবস্থা করতে হয়। একই সময়ে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমার সম্ভাবনাও থাকে।

ফলে কামরুজ্জামানের বাগানে উৎপাদিত সাম্মামের প্রকৃত আর্থিক সাফল্য নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কত কেজি ফল উৎপাদন হলো, কত দামে বিক্রি হলো এবং মোট ব্যয়ের পর হাতে কত টাকা থাকলো তার ওপর।

এদিকে নতুন এ ফলের বাগান দেখতে আশপাশের কৃষকেরাও আসছেন। কেউ জানতে চাইছেন চারা কোথা থেকে পাওয়া যায়, কেউ জানতে চাইছেন এক বিঘায় কত খরচ হয়। আবার অনেকে জানতে চাইছেন, কত দিনে ফল আসে এবং বাজারে কী দামে বিক্রি করা যায়।

কামরুজ্জামানের উদ্যোগ শুধু একটি বাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন ও উচ্চমূল্যের ফল চাষের বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ,বাজার বিশ্লেষণ এবং উৎপাদন খরচের হিসাব করে সাম্মাম চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কাপাসিয়ায় এ ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এক মৌসুমের ফলন ও বিক্রির হিসাব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ধারণের সুযোগ নেই।

বাগানে এখনো পরিপক্ব হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে অনেক ফল। সেগুলো বাজারে যাওয়ার পরই পরিষ্কার হবে। কাপাসিয়ার মাটিতে নতুন এ বিদেশি ফল কৃষকের জন্য শুধু নতুনত্ব, নাকি সত্যিই নতুন আয়ের পথ।

রিপোর্টার্স২৪

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recent Comments

No comments to show.